Sunday, April 14, 2024
HomeNews Updateঅধিকার মিলেছে ওড়িশায়, বাংলায় ব্রাত্য ভারতীয় উপমহাদেশের লুপ্তপ্রায় বিরল জনজাতি ‘শিয়ালগিরি’র অস্তিত্ব...

অধিকার মিলেছে ওড়িশায়, বাংলায় ব্রাত্য ভারতীয় উপমহাদেশের লুপ্তপ্রায় বিরল জনজাতি ‘শিয়ালগিরি’র অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মেদিনীপুরের গবেষক !

spot_imgspot_img
spot_imgspot_img

নিউজবাংলা ডেস্ক :  ভারতীয় উপমহাদেশের একটি লুপ্তপ্রায় সম্প্রদায় বা জনজাতির নাম ‘শিয়ালগিরি’। অতীতে একসময়ে নানাবিধ বন্যপশুর কাঁচা মাংস খেত, শিকার করত অরণ্যের গভীরে গভীরে, চুরি করে দিন গুজরান করত শিয়ালগিরিরা। যোগেশচন্দ্র বসুর মতো ইতিহাসবিদের অনুমান, এরা মারাঠা বর্গীদের বংশধর। আবার ও’ ম্যালি সাহেবের বিচারে এরা গুজরাত-মধ্যপ্রদেশ (Siyalgiri Janajati) সীমানার ‘ভিল’ জনজাতির একটি ভবঘুরে শাখা। এহেন শিয়ালগিরি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে ওড়িশা সীমানায় অবস্থিত দাঁতন ও মোহনপুর থানা এলাকায়।

তবে দীর্ঘ আন্দোলনের পরেও এই সম্প্রদায় তপশীলি জাতিভুক্তি থেকে বঞ্চিত। আর এই বঞ্চনার বিরুদ্ধেই এবার আন্দোলনে সামিল মেদিনীপুরের গবেষক তথা শিয়ালগিরি আন্দোলনের মুখপাত্র সন্তু জানা। ইতিমধ্যেই ‘শিয়ালগিরি’ জনজাতির মানুষের আবছা ইতিহাস, লোকায়ত জীবন, ধর্ম, ভাষা, শিক্ষা, সমাজজীবনের কথা, আন্দোলন প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণা করে গত কলকাতা বইমেলায় একটি বই প্রকাশ করেছেন। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে শিয়ালগিরি সম্প্রদায়ের মানুষদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই।

সন্তু জানান, “প্রায় ২৫০ বছর ধরে এই যাযাবর শ্রেণির মানুষরা কেবলমাত্র মেদিনীপুর জেলায় বাস করত। আজও দক্ষিণবঙ্গের ওড়িশা সীমানায় অবস্থিত দাঁতন ও মোহনপুর থানায় এদের বসতি। সীমানা পেরিয়ে ওড়িশার বালিয়াপাল, ভোগরাই ও সুগো অঞ্চলেও এদের আত্মীয়স্বজনের বসবাস”। তবে এই সম্প্রদায় নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কেই অজ্ঞ ছিলেন বলেই দাবী সন্তু’র। তিনি জানান, “এই জনজাতি নিজেদের শবর বলে জানতেন। তাই প্রথমবার এই জনজাতিকে শিয়ালগির সম্প্রদায় হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে”।

সন্তু জানান, “দীর্ঘ গবেষণার পর শিয়ালগিরি সম্প্রদায়ের বিষয়ে একপ্রকার নিশ্চিত হয়েই এদের নিয়ে লেখা শুরু করি। তা নিয়ে অনেক সমস্যার মুখে পড়তে হয়। পরে সরকারী ভাবে এদের নিয়ে সার্ভে হলে এই জনজাতি শবর নয় বলেই জানা যায়। সেই সঙ্গে এই জনজাতির প্রায় শতাধিক পরিবারের তথ্য তালাশের পর বেশ কিছু পুরানো দলিল উদ্ধার হয়েছে যেখানে এরা শিয়ালগিরি সম্প্রদায় বলে উল্লেখ রয়েছে। শিয়ালগিরি সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০০০ মানুষ এখনও কেবল বাংলা-ওড়িশা সীমানায় বসবাস করে” বলে জানিয়েছেন তিনি।

সন্তু আরও জানান, “১৯৫১ সালে আদমসুমারিতে এদের ‘ম্লেচ্ছ ভক্ষণকারী’ জনজাতি হিসেবে সর্বনিম্ন তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। এদের সঙ্গী ছিল, ডোম, চামার, কোড়া প্রভৃতি। শিয়ালগিরি সম্প্রদায় নিজেদের হিন্দু বলে দাবি করে। কিন্তু মৃতদেহ চিতায় ওঠে না, বরং কবরে যায়। এদের কোনও ধর্মস্থান নেই। বাড়ির এক কোণে কলসিতে সিঁদুর লাগিয়ে এরা বংশপরম্পরায় প্রেত পুজো করত”।

তাঁর মতে, “শিয়ালগিরিদের লৌকিক জীবন সত্যিই বিস্ময়কর। যাযাবর অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সামাজিক হয়ে গিয়েছে এরা। সমাজজীবন ও খাদ্যাভাসে এসেছে বহুল পরিবর্তন৷ এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের লোকায়ত সংস্কৃতি, রীতি ও ভাষা ভুলে গিয়েছে বেমালুম। একশো বছর আগে থেকেই নিজেদের পদবী পরিবর্তন করে হয়েছিল দাস, পাত্র, জানা, বারিক প্রভৃতি। বর্তমানের শিয়ালগিরি অতীতের ফসিল মাত্র। ১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ ভাষাবিদ গ্রিয়ার্শন সাহেব প্রথম এদের খোঁজ পেয়েছিলেন দাঁতন থানায়”।

এহেন লুপ্তপ্রায় জনজাতিদের নিয়ে সম্প্রতি দাঁতন থানার নিমপুরে আয়োজিত এক সভায় এলাকায় বসবাসকারী অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষরা শিয়ালগিরি, সম্প্রদায় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। সভায় উপস্থিত ছিলেন দাঁতনের বিধায়ক বিক্রমচন্দ্র প্রধান, দাঁতন ১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কনক পাত্র, গবেষক তথা শিয়ালগিরি আন্দোলনের মুখপাত্র সন্তু জানা, আন্দোলনের সভাপতি ভজহরি পাত্র, গিরিশ পাত্র, শিক্ষক শিবশঙ্কর সেনাপতি সহ প্ৰায় শতাধিক শিয়ালগিরি সম্প্রদায়ের মানুষজন।

প্রসঙ্গতঃ গত বছর স্থানীয় বিধায়ক বিক্ৰমচন্দ্ৰ প্রধান বিষয়টি বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর গোচরে এনেছিলেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামে গিয়ে সমীক্ষা করা হলেও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে এই এলাকার বাসিন্দারা জাতিগত শংসাপত্র পাননি। সভায় বিধায়ক বিক্রম প্রধান বলেন, এই মুহূর্তে নির্বাচনের আদর্শ আচরণবিধি চালু হয়ে গিয়েছে তাই আমি কোনও প্রতিশ্রুতি দিতে পারব না। তবে নির্বাচন মিটলে এই গবেষণাপত্রকে সামনে রেখে আবারও মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। জানা যায়, ২০১৭ সালে ওড়িশা সরকার আন্দোলনকারী শিয়ালগিরিদের মান্যতা প্রদান করে তফসিলি জাতির তালিকাভুক্ত করেছে।

spot_imgspot_img
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments